ভালোবাসার সম্পর্কে ঈর্ষা নতুন কিছু নয়। সঙ্গী অন্য কারও সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ঠভাবে কথা বললে, কারও প্রশংসা করলে বা পুরানো কোনো পরিচিতের সঙ্গে যোগাযোগ রাখলে অস্বস্তি হতে পারে।
তবে সঙ্গীর বর্তমান আচরণ নয় বরং তার অতীতের প্রেম, পুরানো সম্পর্ক বা সাবেক সঙ্গীকে নিয়ে যদি বারবার মনে প্রশ্ন তৈরি হয়টা ভিন্ন মানসিকতা প্রকাশ করে।
কারণ সম্পর্কটি বর্তমান, মানুষটি সঙ্গেই আছেন, তবু তার অতীতের কোনো মানুষকে ঘিরে মনে তৈরি হচ্ছে তুলনা, ভয়, সন্দেহ কিংবা হীনম্মন্যতা।
সঙ্গীর সাবেক প্রেমিক বা প্রেমিকার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পাতা খুঁজে দেখা দিয়ে বিষয়টির শুরু হতে পারে।
প্রথমে হয়ত শুধু জানতে ইচ্ছা করল, মানুষটি এখন কী করেন, কোথায় থাকেন বা দেখতে কেমন। এরপর একসময় তার পুরানো ছবি, বন্ধু, পড়াশোনা, কাজ বা জীবনের নানান তথ্য খুঁজে দেখার প্রবণতাও তৈরি হতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে সেই খোঁজ নেওয়া এতটাই বেড়ে যায় যে, দিনে একাধিকবার সাবেক সঙ্গীর জীবন সম্পর্কে নতুন কিছু জানার চেষ্টা চলতে থাকে। এই প্রবণতাকে বলা হয় ‘পশ্চাৎপ্রেম-ঈর্ষা’।
এই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েশিভা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং মনোবিজ্ঞানী সাবরিনা রোমানফ রিয়েলসিম্পল ডটকমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ব্যাখ্যা করেন যে, “এটি তখনই দেখা যায় যখন সঙ্গীর অতীতের প্রেম বা সম্পর্ক নিয়ে অন্যজন নিজেকে হুমকির মুখে মনে করেন এবং বিষয়টি নিয়ে বারবার চিন্তা করতে থাকেন।
সাধারণ কৌতূহলের সঙ্গে এর পার্থক্য হলো, এখানে মূল বিষয় হয়ে দাঁড়ায় নিজেকে অতীতের মানুষের তুলনায় কম মনে হওয়া।”
অতীত যে কারণে বর্তমানের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে
স্বাভাবিক কৌতূহল থেকে মানুষ সঙ্গীর আগের সম্পর্ক সম্পর্কে জানতে চাইতেই পারেন। আগের সম্পর্ক কতদিন ছিল, কেন শেষ হয়েছিল বা সেই অভিজ্ঞতা বর্তমান মানুষটির ব্যক্তিত্বে কী প্রভাব ফেলেছে— এসব জানা কখনও কখনও নতুন সম্পর্ককে বুঝতেও সাহায্য করে।
তবে কৌতূহল যখন নিজের সঙ্গে সাবেক সঙ্গীর তুলনায় পরিণত হয়, তখন পরিস্থিতি বদলে যায়।
মার্কিন মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসক ব্রিয়ানা পারুওলো একই প্রতিবেদনে বলেন, “মনে হতে পারে, ‘সে কি আমার চেয়ে সুন্দর ছিল?’, ‘আমার সঙ্গী কি তাকে আমার চেয়ে বেশি ভালোবাসতেন?’, ‘তার পরিবারের কাছে কি আগের মানুষটিই বেশি পছন্দের ছিল?’ এমন প্রশ্নের কোনো শেষ থাকে না। একটি উত্তর পাওয়ার পরও নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়। সঙ্গী যতই আশ্বস্ত করুক মনে হয়, হয়ত তিনি পুরো সত্য বলছেন না।”
তার মতে, “পশ্চাৎপ্রেম-ঈর্ষা নিছক কৌতূহলের চেয়ে বেশি কিছু এবং এটি মনে অনুপ্রবেশকারী ও কষ্টদায়ক চিন্তা তৈরি করতে পারে। এমনকি সাবেক সঙ্গীর সঙ্গে বর্তমান সম্পর্ক আবার তৈরি হওয়ার বাস্তব কোনো সম্ভাবনা না থাকলেও মনে নানান ‘যদি’ তৈরি হতে থাকে।”
সাবেক সঙ্গীর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কেন ফাঁদ হয়ে উঠতে পারে?
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এই সমস্যাকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে। কারণ সেখানে অন্য একজন মানুষের জীবনের নির্বাচিত কিছু মুহূর্ত খুব সহজেই দেখা যায়।
সাবেক সঙ্গীকে সুন্দর পোশাকে কোনো অনুষ্ঠানে দেখা গেল, ভ্রমণের ছবি দেখা গেল কিংবা নতুন কোনো সাফল্যের খবর চোখে পড়ল— তখন নিজের জীবনের সঙ্গে তার তুলনা শুরু হতে পারে।
তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা জীবন কখনই একজন মানুষের পুরো জীবন নয়। তবু ঈর্ষায় আক্রান্ত মানুষ সেই ছবিগুলোকে নিজের বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। মনে হতে পারে, ‘সে আমার চেয়ে ভালো আছে’, ‘আমার সঙ্গী হয়তো এমন জীবনই চেয়েছিলেন’ কিংবা ‘আমি তার যোগ্য নই।’
ব্রিয়ানা পারুওলো’র মতে, “সাবেক সঙ্গীর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম খুঁজে দেখা প্রতিদিন এমনকি ঘণ্টায় ঘণ্টায় দেখা, একটি অভ্যাসে পরিণত হতে পারে। মানুষ তখন নিজের মন খারাপ হওয়ার আরও কারণ খুঁজতে থাকে। অর্থাৎ, যা দেখে ভালো লাগবে ভেবে খোঁজ শুরু করা হয়েছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত আরও অস্বস্তি তৈরি করে।”
যে পর্যায়ে এটি স্বাভাবিক থাকে না
নতুন সম্পর্কের শুরুতে সঙ্গীর অতীত সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক। বরং আগের সম্পর্ক সম্পর্কে কিছু তথ্য জানা কখনও কখনও বর্তমান সঙ্গীকে বুঝতে সাহায্য করতে পারে।
তবে সেই কৌতূহল যদি সারাক্ষণের চিন্তার বিষয় হয়ে যায়, তাহলে সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন আছে।
সঙ্গীকে একই প্রশ্ন বারবার করা, একই বিষয়ে বারবার আশ্বাস চাওয়া, সাবেক সঙ্গীর সঙ্গে নিজেকে তুলনা করা এবং উত্তর পাওয়ার পরও সন্তুষ্ট না হওয়া— এসব আচরণ সমস্যাটিকে গভীর করতে পারে।
ব্রিয়ানা পারুওলোর ভাষায়, “এমন পরিস্থিতিতে সঙ্গীকে বারবার জিজ্ঞাসাবাদ করার প্রবণতা দেখা দিতে পারে, কিন্তু কোনো উত্তরই যথেষ্ট মনে হয় না।”
সাবরিনা রোমানফ মনে করেন, “যখন অতীতের মানুষ বর্তমান সম্পর্কে বাস্তবে কোনও ভূমিকা না রেখেও একজনের চিন্তা ও নিরাপত্তাবোধকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেন, তখন বিষয়টি ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে যদি এই চিন্তার কারণে নিজের মানসিক শান্তি নষ্ট হয় কিংবা বর্তমান সম্পর্কেও টানাপোড়েন তৈরি হয়, তাহলে সেটিকে আর সাধারণ ঈর্ষা বলে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়।”
সমস্যার পেছনে থাকতে পারে নিজের সম্পর্কে অনিশ্চয়তা
পশ্চাৎপ্রেম-ঈর্ষার ক্ষেত্রে অনেক সময় সমস্যার কেন্দ্র সাবেক সঙ্গী নন। আসল বিষয় হতে পারে নিজের সম্পর্কে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা।
নিজের চেহারা, যোগ্যতা, ব্যক্তিত্ব, ভালোবাসার ক্ষমতা কিংবা সম্পর্কের নিরাপত্তা নিয়ে সন্দেহ থাকলে সঙ্গীর অতীত সেই ভয়কে আরও উসকে দিতে পারে।
সাবরিনা রোমানফের মতে, “এই ধরনের পরিস্থিতিতে মানুষ এমন এক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জড়িয়ে পড়েন, যেখানে প্রতিপক্ষ আসলে অতীতের মানুষ, যিনি বর্তমানে সম্পর্কটির অংশই নন।”
এর সমাধান হিসেবে বারবার সঙ্গীর কাছ থেকে আশ্বাস চাওয়া শুরু হতে পারে। তবে সেই আশ্বাস সাময়িক স্বস্তি দিলেও ভেতরের ভয় দূর করে না
বারবার আশ্বাস চাওয়া যে কারণে সমাধান নয়
সঙ্গীকে জিজ্ঞেস করা, ‘তুমি কি আমাকে বেশি ভালোবাসো?’, ‘তোমার সাবেকের সঙ্গে কি আমার তুলনা হয়?’, ‘তুমি কি এখনও তাকে মনে করো?’— এসব প্রশ্নের উত্তর হয়তো কিছুক্ষণের জন্য স্বস্তি দেবে। কিন্তু একই ভয় আবার ফিরে এলে একই প্রশ্নও ফিরে আসবে।
সাবরিনা রোমানফ বলেন, “সমস্যার উৎস যদি নিজের চিন্তা ও অনুভূতির মধ্যে থাকে, তাহলে শুধু সঙ্গীকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা বা তার কাছ থেকে বারবার আশ্বাস নেওয়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। নিজের ভয় কোথা থেকে তৈরি হচ্ছে, সেটি বোঝা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে একটু দূরে থাকা
সাবেক সঙ্গীর পাতা দেখতে ইচ্ছা করলে প্রথম কাজ হতে পারে সেই তাগিদটিকে চেনা ও বোঝা।
ব্রিয়ানা পারুওলো পরামর্শ দেন, “নিজের কাছে স্বীকার করা যেতে পারে— ‘আমি ওই ব্যক্তির পাতা দেখতে চাইছি, কিন্তু আমি কী করব, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আমার আছে।”
এরপর নিজেকে প্রশ্ন করা যায়, ওই পাতা দেখলে সত্যিই কি ভালো লাগবে? নাকি আরও খারাপ লাগবে? উত্তর যদি হয় আরও খারাপ লাগবে, তাহলে কয়েক মিনিটের জন্য নিজেকে অন্য কোনও কাজে ব্যস্ত রাখা যেতে পারে।
ফোনটি অন্য ঘরে রেখে দেওয়া, একটু হাঁটতে যাওয়া, কোনও বন্ধু বা পরিবারের সদস্যের সঙ্গে কথা বলা বা অন্য কোনো কাজে মন দেওয়া সেই মুহূর্তের তাড়নাটি সামলাতে সাহায্য করতে পারে।
এখানে মূল উদ্দেশ্য নিজের অনুভূতিকে জোর করে মুছে ফেলা নয়। বরং অনুভূতি তৈরি হলেও, সঙ্গে সঙ্গে কাজ না করা। কারণ একটি চিন্তা মাথায় আসা এবং সেই চিন্তা অনুযায়ী কাজ করা— দুটি আলাদা বিষয়।
নিজের মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনা জরুরি
এই সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, নিজের প্রতি আস্থা তৈরি করা। অন্য একজন মানুষ দেখতে কেমন, কী করেছেন, কোথায় ঘুরেছেন বা বর্তমানে কেমন জীবন কাটাচ্ছেন, এসব দিয়ে নিজের মূল্য নির্ধারণ করা যায় না।
সাবরিনা রোমানফ মন্তব্য করেন, “অনেক সময় নিজের লজ্জা, অযোগ্যতার অনুভূতি বা নিজেকে কম মনে করার প্রবণতার কারণে বর্তমান সম্পর্ককেই ক্ষতিগ্রস্ত করে ফেলেন।”
তাই নিজের ভেতরের এই অনুভূতিগুলো কীভাবে সক্রিয় হচ্ছে, তা বোঝা প্রয়োজন।
🏷️ Tags — সঙ্গীর সাবেক, সাবেক প্রেমিক, সাবেক প্রেমিকা, ঈর্ষা, সম্পর্ক, ভালোবাসা, দাম্পত্য সম্পর্ক, প্রেমের সম্পর্ক, সম্পর্কের সমস্যা, মানসিকতা, মনোবিজ্ঞান, সম্পর্কের মনোবিজ্ঞান, ভালোবাসায় নিরাপত্তাহীনতা, আবেগ, সম্পর্কের টানাপোড়েন
#️⃣ Hashtags —
#সঙ্গীরসাবেক #ঈর্ষা #সম্পর্ক #ভালোবাসা #দাম্পত্যসম্পর্ক #প্রেম #সম্পর্কেরসমস্যা #মনোবিজ্ঞান #সম্পর্কেরমনোবিজ্ঞান #নিরাপত্তাহীনতা #আবেগ #ভালোবাসারসম্পর্ক
0 Comments